পটুয়াখালী: জেলায় মাদক নিয়ে বিরোধের জেরে অটোরিকশাচালক মো. জাকারিয়া শরীফ (২৮) হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে মো. সাইফুল ইসলাম (২৯) ও মো. মামুন হাওলাদার (২৯) এবং চোরাই ব্যাটারি কেনার অভিযোগে মো. শুক্কুর আকন (৪৫) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে নিহত জাকারিয়ার অটোরিকশা, চুরি যাওয়া তিনটি ব্যাটারি ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সিএনজি উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পটুয়াখালী জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল। তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনে শহরের বিভিন্ন এলাকার শতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। পরে পৃথক অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে পটুয়াখালী শহরের মুচিরপোল স্ট্যান্ড থেকে যাত্রী নিয়ে অটোরিকশা চালিয়ে বের হন জাকারিয়া। এরপর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরদিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সদর উপজেলার চর জৈনকাঠী ইউনিয়নের শৌলা খেয়াঘাটসংলগ্ন লোহালিয়া নদীতে এক ব্যক্তির লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। পরিবারের সদস্যরা সেটি জাকারিয়ার লাশ বলে শনাক্ত করেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জাকারিয়াকে গলায় ক্যাবল পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবা মো. রুহুল আমিন শরীফ বাদী হয়ে ১০ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২, ৩৭৯, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জাকারিয়ার সঙ্গে সাইফুল ইসলামের পূর্বপরিচয় ছিল। মাদক সরবরাহের কথা বলে জাকারিয়ার কাছ থেকে সাইফুল ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। পরে মাদক সরবরাহ না করায় তাঁদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর জেরে সাইফুল ও মামুন জাকারিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সাইফুল ফোন করে জাকারিয়াকে চৌরাস্তা এলাকায় ডেকে নেন। সেখানে মামুনও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে জৈনকাঠী খেয়াঘাটে মাদক চালান আসার কথা বলে জাকারিয়াকে সাইফুলের সিএনজিতে করে সেখানে নেওয়া হয়। সেখানে টাকা নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সাইফুল জাকারিয়ার গলায় ক্যাবল পেঁচিয়ে ধরেন এবং মামুন তাঁর পা চেপে ধরেন বলে পুলিশের দাবি। পরে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর জাকারিয়ার লাশ লোহালিয়া নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
পুলিশ আরও জানায়, হত্যার পর জাকারিয়ার অটোরিকশাটি নিয়ে সাইফুল ও মামুন বিসিক শিল্প এলাকার পশ্চিম পাশে নদীর পাড়ে যান। সেখানে অটোরিকশা থেকে তিনটি ব্যাটারি খুলে নেওয়া হয়। পরে অটোরিকশাটি নদীতে ফেলে দেওয়া হয় এবং ব্যাটারিগুলো মহিপুরে শুক্কুর আকনের কাছে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর সাইফুল প্রথমে ভোলা, পরে কুমিল্লা হয়ে গাজীপুরে চলে যান বলে পুলিশের দাবি। অন্যদিকে মামুন পটুয়াখালীতে অবস্থান করছিলেন। গত ২৬ সেপ্টেম্বর পৃথক অভিযান চালিয়ে গাজীপুর থেকে সাইফুল, পটুয়াখালী সদর এলাকা থেকে মামুন এবং মহিপুর এলাকা থেকে শুক্কুর আকনকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুক্কুরের কাছ থেকে জাকারিয়ার চুরি যাওয়া তিনটি ব্যাটারি উদ্ধার করা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল বলেন, শতাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়। পুলিশের দাবি, সাইফুল ও মামুন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার কথা এবং শুক্কুর চোরাই ব্যাটারি কেনার কথা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত বা সহযোগিতা করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
Share.
Leave A Reply