সমুদ্রসৈকত, ম্যানগ্রোভ বন, খাল, জলাভূমি ও পর্যটন অবকাঠামোকে ঘিরে কুয়াকাটাকে পরিকল্পিত পর্যটননগর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই সরকারি খাস জমি, জলাভূমি, খাল, প্লাবনভূমি ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল জমি সঠিকভাবে চিহ্নিত ও সুরক্ষিত করা না গেলে ভবিষ্যতের উন্নয়নই জমির সংকটে আটকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে শুধু হোটেল-রিসোর্টের জন্য জমি প্রয়োজন নয়। প্রয়োজন সড়ক, ড্রেনেজ, জলাধার, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যটন সুবিধা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার অবকাঠামোর জন্যও পর্যাপ্ত সরকারি জমি।

কুয়াকাটাকে ঘিরে প্রণীত Payra-Kuakata Comprehensive Plan (PKCP)-এ ভূমি ব্যবহারের বিভিন্ন শ্রেণি নির্ধারণের কাঠামো রয়েছে। পর্যটন, আবাসিক এলাকা, পরিবহন, জলাশয়, উপকূলীয় এলাকা ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল ভূমিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ কুয়াকাটার উন্নয়ন নির্ভর করছে কোথায় স্থাপনা হবে এবং কোথায় স্থাপনা হবে না—এই দুইয়ের সমন্বয়ের ওপর।

তবে মাঠপর্যায়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি খাস জমির সঠিক হিসাব ও দখল পরিস্থিতি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে কুয়াকাটার সরকারি খাস জমি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। কলাপাড়া ভূমি কার্যালয়ের সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাউয়ারচর মৌজায় ৩০০ একরের বেশি সরকারি খাস জমি রয়েছে। একই প্রতিবেদনে সরকারি খাস জমিতে বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড স্থাপনের বিষয়ও উঠে এসেছে।

অন্যদিকে আরেক প্রতিবেদনে কুয়াকাটায় প্রায় ২ হাজার একর খাস জমি ব্যক্তির নামে রেকর্ড হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। ভূমি জরিপের বিভিন্ন ধাপ, পুরোনো বন্দোবস্ত, কথিত ‘লুজ খতিয়ান’, ভূমি উন্নয়ন করের রশিদ এবং দখল-বিক্রির মাধ্যমে সরকারি জমি ব্যক্তি মালিকানায় চলে যাওয়ার অভিযোগও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলো এখনো যাচাইসাপেক্ষ। তাই প্রকৃত মালিকানা ও ভূমি-রেকর্ড যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এ বাস্তবতা কুয়াকাটার ল্যান্ড জোনিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। যে জমি ভবিষ্যতে সরকারি সড়ক, পর্যটন পার্ক, ড্রেনেজ, জলাধার কিংবা উন্মুক্ত স্থান হিসেবে প্রয়োজন হতে পারে, সেটি যদি এরই মধ্যে দখল বা বিতর্কিত মালিকানায় চলে যায়, তাহলে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সরকারি ব্যবস্থাপনা কাঠামোতেও পৌর এলাকার খাস জমির তালিকা তৈরি, জমির ব্যবহারযোগ্যতা নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে সরকারি ও জনকল্যাণমূলক কাজে প্রয়োজন হতে পারে—এমন জমি চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে জেলা ও উপজেলা ভূমি প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যে খাস জমি চিহ্নিতকরণ, উদ্ধার, সীমানা নির্ধারণ এবং খাস জমির তালিকা হালনাগাদের বিষয় রয়েছে।

পানি নিষ্কাশনেও বাড়তে পারে ঝুঁকি

কুয়াকাটা নিম্নাঞ্চল ও জোয়ার-ভাটাপ্রবণ এলাকা হওয়ায় খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের জায়গা দখল বা ভরাট হলে ভবিষ্যৎ নগরায়ণের সঙ্গে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

পরিকল্পিত সড়ক ও স্থাপনা নির্মাণ হলেও পানি যাওয়ার প্রাকৃতিক পথ যদি সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে উন্নয়ন মানুষের দুর্ভোগ কমানোর পরিবর্তে নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই কুয়াকাটার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় খাল, জলাশয় ও প্লাবনভূমি সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বাড়তে পারে উন্নয়ন ব্যয়

সরকারি খাস জমি এখনই চিহ্নিত ও সুরক্ষিত না করা হলে ভবিষ্যতে সরকারকে নিজেদের প্রয়োজনের জমিই কিনতে হতে পারে। বর্তমানে সরকারি মালিকানাধীন কোনো জমি যদি দখল, অবৈধ বন্দোবস্ত বা বিতর্কিত রেকর্ডের কারণে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, পরে সড়ক, পার্ক, ড্রেনেজ বা পর্যটন সুবিধা নির্মাণে অধিগ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।

এতে প্রকল্প ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মামলা-মোকদ্দমার কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিবেশ সুরক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ খাস জমি

কুয়াকাটার পর্যটন অর্থনীতি অনেকটাই প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। গঙ্গামতির ম্যানগ্রোভ বন, সৈকতসংলগ্ন বাফার এলাকা, খাল, জলাভূমি ও উন্মুক্ত ভূমি কমে গেলে পর্যটননগরীর পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই সরকারি খাস জমি, বনভূমি, জলাভূমি ও অন্যান্য সংবেদনশীল ভূমিকে একই মানচিত্রে এনে সীমানা নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ক্ষেত্রে শুধু ল্যান্ড জোনিং করলেই হবে না। জোনিং ম্যাপের সঙ্গে খাস জমির দাগ-খতিয়ান মিলিয়ে মাঠপর্যায়ে সীমানা দৃশ্যমান করা প্রয়োজন। কোন জমি সরকারের, কোনটি ব্যক্তিমালিকানাধীন, কোনটি বনভূমি, কোনটি জলাশয় এবং কোন এলাকায় ভবিষ্যতে নির্মাণ করা যাবে না—এসব তথ্য একীভূত করা গেলে দখল ও মালিকানা নিয়ে বিরোধও কমানো সম্ভব।

কুয়াকাটার সামনে এখন তাই বড় প্রশ্ন—কোথায় উন্নয়ন হবে, তার আগে কোথায় সরকারি জমি আছে, তা কি নিশ্চিত করা হয়েছে?

খাস জমি দ্রুত চিহ্নিত, রেকর্ড যাচাই, সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ দখলমুক্ত করা না গেলে ভবিষ্যতের পরিকল্পিত কুয়াকাটা প্রয়োজনীয় জমির অভাবে সংকুচিত হতে পারে। তখন পরিকল্পনা থাকবে, বিনিয়োগও থাকবে; কিন্তু সড়ক, ড্রেনেজ, পার্ক, পর্যটন সুবিধা ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

Share.
Leave A Reply