পটুয়াখালীঃ নদীভাঙনের তীব্র আগ্রাসনে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার হাজির হাট এলাকার মানুষের ঘরবাড়ির সঙ্গে এবার হুমকির মুখে পড়েছে পারিবারিক কবরস্থানও। তেঁতুলিয়া নদী ক্রমেই তীরের দিকে এগিয়ে আসায় বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় একে একে ঘর সরিয়ে নিচ্ছেন স্থানীয়রা। নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কায় নিজের বাবা ও দাদির কবর থেকে কঙ্কাল উত্তোলন করে অন্যত্র দাফন করতে বাধ্য হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা নিজাম মৃধা। কবর সরানোর পর এবার নিজের ঘরও সরিয়ে নিয়েছেন তিনি। বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটছে তার।
দশমিনা উপজেলার হাজির হাট বাজারের উত্তর পাশে চৌকিদার বাড়ির দরজা থেকে হাজির হাট মসজিদ পর্যন্ত এলাকায় তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত পাঁচটি পরিবার তাদের বসতঘর সরিয়ে নিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভাঙন অব্যাহত থাকলে আরও দুই শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভাঙনকবলিত এলাকায় বসতঘরের পাশাপাশি রয়েছে পুরোনো কবরস্থান, স্কুল, কৃষিজমি ও মানুষের দীর্ঘদিনের স্মৃতি। নদী যেভাবে তীরের দিকে এগিয়ে আসছে, তাতে এসব স্থাপনা ও সম্পদ যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
নিজাম মৃধার বাবা খলিল মির্জা মারা যান প্রায় ১৩ মাস আগে। তার দাদি মায়া জান বিবি মারা যান প্রায় ১১ বছর আগে। দুজনের কবরই ছিল পারিবারিক ভিটায়। নদীভাঙন সেই কবরগুলোকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। শেষ পর্যন্ত কবর নদীতে বিলীন হওয়ার আগেই কঙ্কাল উত্তোলন করে অন্যের জায়গায় পুনরায় দাফন করতে হয় তাকে। এরপর নিজের বসতঘরও সরিয়ে নিতে হয়েছে। বর্তমানে নিজস্ব বসতভিটা হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তার।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এ এলাকায় তাদের বাবা-দাদাদের কবর, বসতঘর, কৃষিজমি ও দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে। নদীভাঙনের কারণে এসব হারানোর আশঙ্কা শুধু সম্পদ হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক ইতিহাস, পূর্বপুরুষের স্মৃতি, পরিচিত পরিবেশ ও সামাজিক বন্ধন। দীর্ঘদিনের বসতভিটা থেকে সরে গেলে নতুন জায়গায় ঘর তোলা সম্ভব হলেও পূর্বপুরুষের কবর, শৈশবের স্মৃতি এবং পরিচিত সামাজিক পরিসর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
নদীভাঙনের আর্থিক ক্ষতির হিসাব করা গেলেও এর সব ক্ষতি অর্থের অঙ্কে প্রকাশ করা যায় না। ঘরবাড়ি, জমি, কৃষিজমি ও জীবিকা হারানোর পাশাপাশি নতুন জায়গায় বসতি গড়ার খরচ রয়েছে। ঘর সরানো, জমি হারানো, কাজের স্থান পরিবর্তন এবং নতুন করে জীবন শুরু করার ব্যয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে রয়েছে অঅর্থনৈতিক ক্ষতি—পারিবারিক কবর হারানোর আশঙ্কা, পূর্বপুরুষের সঙ্গে ভৌগোলিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়া, বসতভিটার স্মৃতি হারানো, সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
স্থানীয়দের অনেকে এখন নিজেদের ঘর কোথায় সরাবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন, কেউ অস্থায়ীভাবে অন্যের জায়গায় থাকছেন, আবার কেউ খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। নদীর পাড়ে বসবাস করলেও দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকাই তাদের জীবন-জীবিকার কেন্দ্র হওয়ায় হঠাৎ করে অন্যত্র চলে যাওয়া তাদের জন্য সহজ নয়।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে শুধু কয়েকটি পরিবার নয়, পুরো এলাকার জনবসতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। বসতভিটার পাশাপাশি কৃষিজমি ও অন্যান্য স্থাপনা নদীতে চলে গেলে বহু পরিবারকে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হতে হতে পারে। এতে জীবিকার পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধা জানিয়েছেন, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য উপজেলা পরিষদের কয়েকটি কক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যাদের জমি নদীতে ভেঙে গেছে, তারা চাইলে সরকারি খাসজমি বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তবে স্থানীয়দের দাবি, তাৎক্ষণিক আশ্রয় বা সহায়তার পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং বহু পরিবারকে বসতভিটা, কৃষিজমি ও পূর্বপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হারিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে।
